CLASS NO: 01
তাপ কী?
ভাবুন তো, তাপ জিনিসটা কী?
তাপ আসলে এক ধরনের শক্তি। সহজ কথায়, কোনো জিনিসকে তাপ দিলে সেটা গরম হয়ে যায়, আর তার থেকে তাপ বের করে নিলে সেটা ঠান্ডা হয়ে যায়। ঠিক যেমন আমরা আগুনের কাছে গেলে গরম লাগে, আবার বরফে হাত দিলে ঠান্ডা লাগে।
তাপ কীভাবে মাপা হয়?
আমরা যেমন দৈর্ঘ্য মাপি মিটার বা ফুটে, ওজন মাপি কেজি বা গ্রামে, ঠিক তেমনি তাপ মাপারও একক আছে।
- CGS পদ্ধতিতে একক: ক্যালোরি (Calorie)
- SI পদ্ধতিতে একক: জুল (Joule)
- তাপের মাত্রা (বিজ্ঞানের ভাষায় প্রকাশ):
[ML²T⁻²]
(এটা আসলে শক্তিরই মাত্রা)
এককের মধ্যে সম্পর্ক:
- 1 ক্যালোরি ≈ 4.2 জুল
- 1 জুল ≈ 0.24 ক্যালোরি
১ ক্যালোরি তাপ কতটা?
খুব সহজ করে বললে, 1 গ্রাম খাঁটি জল নিন। এবার সেটার তাপমাত্রা 1° সেলসিয়াস বাড়াতে ঠিক যতটুকু তাপ লাগবে, সেই পরিমাণ তাপকেই বলা হয় 1 ক্যালোরি।
তাপ কত রকমের হয়?
তাপকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
-
বোধগম্য তাপ (Sensible Heat):
মানে কী: এই তাপ দিলে কোনো জিনিসের অবস্থা বদলায় না (যেমন জল জলই থাকে), কিন্তু তার তাপমাত্রা বেড়ে যায়। যেমন, জল গরম করা।
কীভাবে মাপা যায়: থার্মোমিটার দিয়ে এর ফল (তাপমাত্রা বৃদ্ধি) বোঝা যায়।
-
লীনতাপ (Latent Heat):
মানে কী: "লীন" কথার মানে হলো "লুকিয়ে থাকা"। এই তাপ দিলে জিনিসের তাপমাত্রা একটুও বাড়ে না, কিন্তু তার অবস্থা বদলে যায়।
উদাহরণ: বরফ গলে জল হওয়ার সময় বা জল ফুটে বাষ্প হওয়ার সময় এই তাপ কাজ করে। বরফ যখন গলে, তখন থার্মোমিটার মাপলে তাপমাত্রা 0°C-তেই আটকে থাকে, যতক্ষণ না পুরো বরফ গলে জল হচ্ছে। এই লুকিয়ে থাকা তাপটাই হলো লীনতাপ।
কীভাবে মাপা যায়: একে থার্মোমিটার দিয়ে সরাসরি মাপা যায় না।
-
বিকীর্ণ তাপ (Radiant Heat):
মানে কী: এই তাপ কোনো মাধ্যম ছাড়াই (এমনকি শূন্যস্থান দিয়েও) এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে।
সেরা উদাহরণ: সূর্য থেকে পৃথিবীতে তাপ এভাবেই আসে। মাঝখানের মহাশূন্যে কোনো বাতাস না থাকলেও তাপ ঠিকই আমাদের কাছে পৌঁছে যায়।
তাপমাত্রা বা উষ্ণতা কী?
তাপমাত্রা হলো কোনো বস্তু কতটা গরম বা ঠান্ডা, তার একটা পরিমাপ।
- তাপ হলো কারণ, আর তাপমাত্রা হলো তার ফল।
- কোনো বস্তুকে তাপ দিলে তার তাপমাত্রা বাড়ে, আর তাপ বের করে নিলে তাপমাত্রা কমে।
তাপ আর তাপমাত্রার মূল পার্থক্য:
ধরুন, দুটি বালতি আছে। একটি বিশাল বড়, অন্যটি খুব ছোট। বড় বালতিটা অর্ধেক জল দিয়ে ভরা, আর ছোট বালতিটা কানায় কানায় ভরা।
- কোনটিতে জল বেশি? অবশ্যই বড় বালতিতে। এই মোট জলের পরিমাণটা হলো তাপ।
- কোনটিতে জলের লেভেল বা উচ্চতা বেশি? ছোট বালতিতে। এই জলের লেভেলটাই হলো তাপমাত্রা।
| বৈশিষ্ট্য |
তাপ (Heat) |
তাপমাত্রা (Temperature) |
| পরিচয় |
তাপ এক ধরনের শক্তি। |
তাপমাত্রা হলো বস্তুর তাপীয় অবস্থা (কতটা গরম বা ঠান্ডা)। |
| কারণ ও ফল |
তাপ হলো কারণ। |
তাপমাত্রা হলো তাপের ফল। |
| পরিমাপক যন্ত্র |
ক্যালোরিমিটার। |
থার্মোমিটার। |
| একক |
ক্যালোরি (Calorie) বা জুল (Joule)। |
সেলসিয়াস (°C), ফারেনহাইট (°F), কেলভিন (K)। |
| ধারণা |
বস্তুর মধ্যে মোট কতটা শক্তি জমা আছে। |
বস্তুটি কতটা গরম বা ঠান্ডা তার অনুভূতি। |
তাপমাত্রা মাপার বিভিন্ন স্কেল
থার্মোমিটার বানানোর জন্য দুটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রাকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। অনেকটা স্কেল বানানোর জন্য 0 দাগ আর 100 দাগ ঠিক করার মতো।
১. নিম্নস্থিরাঙ্ক (বরফবিন্দু):
যে তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ বরফ গলে জল হতে শুরু করে।
- সেলসিয়াস স্কেলে: 0°C
- ফারেনহাইট স্কেলে: 32°F
- কেলভিন স্কেলে: 373K
২. ঊর্ধ্বস্থিরাঙ্ক (স্টিমবিন্দু):
যে তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ জল ফুটে বাষ্প হতে শুরু করে।
- সেলসিয়াস স্কেলে: 100°C
- ফারেনহাইট স্কেলে: 212°F
- কেলভিন স্কেলে: 373K
গলনাঙ্ক, হিমাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক কী?
- গলনাঙ্ক (Melting Point): যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কোনো কঠিন পদার্থ গলতে শুরু করে। যেমন: বরফের গলনাঙ্ক 0°C। (এই সময় লীনতাপ কাজ করে, তাই তাপমাত্রা বাড়ে না)।
- হিমাঙ্ক (Freezing Point): যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কোনো তরল জমে কঠিনে পরিণত হয়। যেমন: জলের হিমাঙ্ক 0°C। (গলনাঙ্ক আর হিমাঙ্ক একই তাপমাত্রা)।
- স্ফুটনাঙ্ক (Boiling Point): যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কোনো তরল ফুটে বাষ্পে পরিণত হতে শুরু করে। যেমন: জলের স্ফুটনাঙ্ক 100°C। (এই সময়ও লীনতাপ কাজ করে, তাই তাপমাত্রা স্থির থাকে)।
তাপমাত্রা স্কেলের মধ্যে রূপান্তরের সূত্র
এক স্কেলের মাপকে অন্য স্কেলে বদলানোর জন্য এই সূত্রগুলো ব্যবহার করা হয়।
সেলসিয়াস (°C) ও কেলভিন (K) এর সম্পর্ক:
K = C + 273
সেলসিয়াস (°C) ও ফারেনহাইট (°F) এর সম্পর্ক (সবচেয়ে জরুরি):
C / 5 = (F - 32) / 9
ফারেনহাইট (°F) ও কেলভিন (K) এর সম্পর্ক:
(F - 32) / 9 = (K - 273) / 5
তাপ কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়?
তাপ তিনভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে:
- পরিবহন (Conduction): কঠিন পদার্থের মধ্যে দিয়ে তাপ যাওয়ার পদ্ধতি।
- উদাহরণ: গরম চায়ের কাপে চামচ রাখলে চামচের হাতলটাও গরম হয়ে যায়।
- পরিচলন (Convection): তরল বা গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে তাপ ছড়ানোর পদ্ধতি।
- উদাহরণ: হাঁড়িতে জল গরম করলে নীচের গরম জল হালকা হয়ে উপরে ওঠে আর উপরের ঠান্ডা জল ভারী বলে নীচে নেমে আসে। এভাবেই পুরো জল গরম হয়।
- বিকিরণ (Radiation): কোনো মাধ্যম ছাড়াই তাপ ছড়িয়ে পড়ার পদ্ধতি।
- উদাহরণ: সূর্য থেকে পৃথিবীতে তাপ আসা বা আগুনের পাশে দাঁড়ালে গরম লাগা।
তাপ গণনার সূত্র
কোনো বস্তুর তাপমাত্রা পরিবর্তন করতে কতটা তাপ লাগবে, তা এই সূত্র দিয়ে বের করা যায়:
Q = m × c × ΔT
এখানে,
- Q = গৃহীত বা বর্জিত তাপ (কতটা তাপ দেওয়া বা নেওয়া হলো)।
- m = বস্তুর ভর (জিনিসটা কতটা ভারী)।
- c = আপেক্ষিক তাপ (কোনো বস্তুর তাপমাত্রা বাড়াতে কতটা তাপ লাগে তার পরিমাপ)।
- ΔT = তাপমাত্রার পরিবর্তন (শেষ তাপমাত্রা - প্রাথমিক তাপমাত্রা)।
ধন্যবাদ