ভূমিকা: আমাদের শরীরের রিমোট কন্ট্রোল
বন্ধুরা, তোমরা যখন কোনো গরম জিনিস ছুঁয়ে ফেলো, তখন কিছু না ভেবেই সাথে সাথে হাতটা সরিয়ে নাও, তাই না? অথবা, তোমাদের পছন্দের খাবার দেখলে মুখে জল চলে আসে।
আসলে, প্রতিটি জীবের শরীরেই একটা অসাধারণ 'রিমোট কন্ট্রোল' সিস্টেম আছে, যা বাইরের পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে। এই প্রক্রিয়াকেই বলে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়।
পর্ব ১: প্রাণীদের কন্ট্রোল সিস্টেম – স্নায়ুতন্ত্র
আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মূল কারিগর হলো নিউরন (Neuron)। এরা হলো আমাদের শরীরের 'ইলেকট্রিক তার', যারা শরীরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে খবর বা সংকেত পৌঁছে দেয়।
সংকেত কীভাবে যায়?
- গ্রাহক (Receptors): আমাদের চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বকের মতো ইন্দ্রিয়গুলো পরিবেশ থেকে তথ্য গ্রহণ করে।
- বৈদ্যুতিক আবেগ (Electrical Impulse): এই তথ্য নিউরনের মাধ্যমে একটা বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিণত হয়।
- সাইন্যাপ্স (Synapse): দুটি নিউরনের মাঝখানে একটা ছোট্ট ফাঁকা জায়গা থাকে। এখানে বৈদ্যুতিক সংকেতটা একটা রাসায়নিক পদার্থে পরিণত হয়ে ফাঁকটা পার হয়।
প্রতিবর্ত ক্রিয়া (Reflex Action):
গরম কিছুতে হাত লাগলে আমরা যে সাথে সাথে হাত সরিয়ে নিই, এই ধরনের দ্রুত এবং স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়াকে বলে প্রতিবর্ত ক্রিয়া। এই কাজটা মস্তিষ্ক পর্যন্ত খবর যাওয়ার আগেই সুষুম্নাকাণ্ডে (Spinal Cord) থাকা একটি শর্টকাট পথের মাধ্যমে হয়ে যায়।
মানব মস্তিষ্ক (Human Brain): আমাদের CPU
মস্তিষ্ক হলো আমাদের শরীরের 'সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট' (CPU)। এটি আমাদের চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং শরীরের সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
মস্তিষ্কের তিনটি প্রধান অংশ:
-
অগ্র-মস্তিষ্ক (Fore-brain): এটা হলো মস্তিষ্কের প্রধান চিন্তাভাবনার অংশ। শোনা, দেখা, গন্ধ নেওয়া, খিদে পাওয়া, স্মৃতি—এই সবকিছুর কেন্দ্র এখানেই।
-
মধ্য-মস্তিষ্ক (Mid-brain): এটি কিছু অনৈচ্ছিক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
-
পশ্চাৎ-মস্তিষ্ক (Hind-brain): এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে:
- স্নায়ুযোজক (Pons): শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- সুষুম্নাশীর্ষক বা মেডুলা (Medulla): হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, বমি করার মতো অনৈচ্ছিক কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।
- লঘুমস্তিষ্ক বা সেরিবেলাম (Cerebellum): এটি আমাদের শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে। সাইকেল চালানো বা একটা সরলরেখায় হাঁটার মতো সূক্ষ্ম কাজগুলো এর জন্যই সম্ভব হয়।
সুরক্ষা: মস্তিষ্কের মতো নরম অঙ্গকে রক্ষা করার জন্য মাথার খুলি (Cranium) আছে। আর সুষুম্নাকাণ্ডকে রক্ষা করার জন্য আছে মেরুদণ্ড (Vertebral Column)।
পর্ব ২: উদ্ভিদের সমন্বয় (Coordination in Plants)
উদ্ভিদের তো আর মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্র নেই! তাহলে ওরা কীভাবে পরিবেশের সাথে যোগাযোগ করে? ওরা এটা করে হরমোনের (Hormones) মাধ্যমে।
বৃদ্ধি-নির্ভর চলাচল বা ট্রপিক চলন (Tropic Movement):
এটা হলো উদ্দীপকের দিকে বা তার বিপরীত দিকে বৃদ্ধি পাওয়া।
- ফটোট্রপিজম (Phototropism): আলোর দিকে গাছের কাণ্ডের বেঁকে যাওয়া।
- জিওট্রপিজম (Geotropism): অভিকর্ষের দিকে মূলের বৃদ্ধি পাওয়া।
- হাইড্রোട്രপিজম (Hydrotropism): জলের দিকে মূলের বৃদ্ধি।
উদ্ভিদ হরমোন (Plant Hormones):
এরা হলো রাসায়নিক দূত, যারা উদ্ভিদের বৃদ্ধি, বিকাশ এবং পরিবেশের প্রতি সাড়া দেওয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
- অক্সিন (Auxin): কাণ্ড ও মূলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- জিব্বেরেলিন (Gibberellin): কাণ্ডের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- সাইটোকাইনিন (Cytokinin): কোষ বিভাজনকে দ্রুত করে।
- অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (Abscisic Acid): এটি একটি বৃদ্ধি প্রতিরোধক হরমোন, যা পাতা ঝরে পড়তে সাহায্য করে।
পর্ব ৩: প্রাণীদের হরমোন (Hormones in Animals)
স্নায়ুতন্ত্র ছাড়াও প্রাণীদের শরীরে রাসায়নিক যোগাযোগের জন্য অন্তঃক্ষরা তন্ত্র (Endocrine System) আছে, যা হরমোন তৈরি করে। হরমোন সরাসরি রক্তে মিশে শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় বার্তা পৌঁছে দেয়।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোন ও তাদের কাজ:
- অ্যাড্রেনালিন (Adrenaline): রাগ, ভয় বা উত্তেজনার সময় শরীরকে "লড়াই বা পালানো" (fight or flight) পরিস্থিতির জন্য তৈরি করে।
- থাইরক্সিন (Thyroxin): শরীরের বিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এর জন্য আয়োডিন প্রয়োজন। এর অভাবে গলগণ্ড (Goitre) রোগ হয়।
- বৃদ্ধি হরমোন (Growth Hormone): শরীরের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। এর অভাবে বামনত্ব (Dwarfism) হয়।
- ইনসুলিন (Insulin): রক্তে শর্করার (চিনি) মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এর অভাবে ডায়াবেটিস (Diabetes) রোগ হয়।
- টেস্টোস্টেরন (পুরুষ) ও ইস্ট্রোজেন (মহিলা): বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী।
ফিডব্যাক মেকানিজম (Feedback Mechanism): শরীরে হরমোন কখন এবং কতটা নিঃসৃত হবে, তা এই পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। যেমন, রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে গেলে অগ্ন্যাশয় বেশি করে ইনসুলিন তৈরি করে। আবার, চিনির মাত্রা কমে গেলে ইনসুলিন নিঃসরণও কমে যায়।