ভূমিকা: জীবন্ত আর জড়ের মধ্যে পার্থক্য কী?
বন্ধুরা, তোমরা যখন একটা কুকুরকে দৌড়াতে বা একটা মানুষকে হাসতে দেখো, তখন তোমরা সহজেই বুঝে যাও যে সে জীবন্ত। কিন্তু একটা ঘুমন্ত কুকুর বা একটা স্থির গাছকে দেখে কীভাবে বুঝবে যে তারা জীবন্ত?
আসলে, জীবন্ত থাকার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাদের শরীরের ভেতরে সবসময় কিছু না কিছু কাজ চলতে থাকে। যেসব প্রক্রিয়া একসাথে মিলে এই জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার কাজটা করে, তাদেরকেই বলে জীবন প্রক্রিয়া (Life Processes)।
পর্ব ১: পুষ্টি (Nutrition) - বেঁচে থাকার জন্য খাবার
আমাদের শরীরটা একটা গাড়ির মতো। গাড়ি যেমন তেল ছাড়া চলতে পারে না, আমাদের শরীরও খাবার ছাড়া চলতে পারে না। জীবেরা দুইভাবে খাবার সংগ্রহ করে:
- স্বভোজী (Autotrophs): এরা হলো "নিজেরাই রাঁধুনি"। যেমন, সমস্ত সবুজ গাছপালা সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়ায় নিজেদের খাবার নিজেরাই তৈরি করে।
- পরভোজী (Heterotrophs): এরা হলো "অন্যের ওপর নির্ভরশীল"। যেমন, মানুষ, পশু, পাখি।
মানুষের পুষ্টি (Nutrition in Human Beings):
আমাদের পৌষ্টিক নালী একটা লম্বা টিউবের মতো, যা মুখ থেকে শুরু হয়ে মলদ্বার পর্যন্ত বিস্তৃত।
- মুখ: দাঁত খাবারকে ছোট করে এবং লালারসের উৎসেচক অ্যামাইলেজ শ্বেতসার হজম শুরু করে।
- পাকস্থলী: এখানে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl) ও উৎসেচক পেপসিন প্রোটিন হজম করে।
- ক্ষুদ্রান্ত্র: এটি হজমের প্রধান জায়গা। এখানে যকৃতের পিত্তরস ও অগ্ন্যাশয়ের অগ্ন্যাশয় রস খাবারের সাথে মেশে। হজম হওয়া খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রের আঙুলের মতো ভিলাই (Villi) দ্বারা শোষিত হয়ে রক্তে মিশে যায়।
- বৃহদন্ত্র: অপাচ্য খাবার থেকে জল শোষিত হয়।
পর্ব ২: শ্বসন (Respiration) - খাবার থেকে শক্তি তৈরি
শ্বসন হলো কোষের ভেতরে খাবার (গ্লুকোজ) ভেঙে শক্তি (ATP) তৈরি করার প্রক্রিয়া।
শ্বসন দুই প্রকারের:
- সবাত শ্বসন (Aerobic Respiration): যখন অক্সিজেনের উপস্থিতিতে গ্লুকোজ পুরোপুরি ভেঙে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে শক্তি তৈরি করে।
- অবাত শ্বসন (Anaerobic Respiration): যখন অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে গ্লুকোজ আংশিকভাবে ভাঙে এবং অল্প শক্তি তৈরি করে। যেমন, ইস্টের মধ্যে বা আমাদের পেশী কোষে।
গ্লুকোজ → পাইরুভেট → (অক্সিজেনের উপস্থিতিতে) → CO₂ + H₂O + শক্তি
গ্যাসীয় বিনিময় (Gaseous Exchange):
- উদ্ভিদ: পাতার পত্ররন্ধ্র (Stomata) দিয়ে গ্যাস বিনিময় করে।
- জলজ প্রাণী: জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন ফুলকা (Gills) দিয়ে গ্রহণ করে।
- মানুষ: ফুসফুসের ভেতরে থাকা বেলুনের মতো অ্যালভিওলাই (Alveoli)-তে রক্ত ও বাতাসের মধ্যে গ্যাস বিনিময় হয়।
পর্ব ৩: পরিবহন (Transportation) - দেহের ভেতরে ডেলিভারি সিস্টেম
হজম হওয়া খাবার, অক্সিজেন, জল—এই সব দরকারি জিনিসগুলোকে শরীরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়া এবং বর্জ্য পদার্থগুলোকে বের করে আনার জন্য একটি পরিবহন ব্যবস্থা দরকার।
মানুষের পরিবহন ব্যবস্থা (Human Circulatory System):
- হৃৎপিণ্ড (Heart): এটি আমাদের শরীরের পাম্প। আমাদের হৃৎপিণ্ডে চারটি প্রকোষ্ঠ আছে, যা অক্সিজেনযুক্ত ও অক্সিজেনবিহীন রক্তকে মিশে যেতে দেয় না। একে দ্বৈত সংবহন (Double Circulation) বলে।
- রক্ত (Blood): এটি অক্সিজেন পরিবহন (RBC), রোগ প্রতিরোধ (WBC) এবং রক্ত জমাট বাঁধতে (Platelets) সাহায্য করে।
- রক্তনালী (Blood Vessels): ধমনী, শিরা ও জালক।
উদ্ভিদের পরিবহন ব্যবস্থা (Transport in Plants):
- জাইলেম (Xylem): এটি মূল থেকে জল ও খনিজ লবণ পাতায় পৌঁছে দেয়।
- ফ্লোয়েম (Phloem): এটি পাতায় তৈরি হওয়া খাবার গাছের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেয়।
পর্ব ৪: রেচন (Excretion) - শরীর থেকে বর্জ্য দূর করা
শরীরের বিভিন্ন কাজের ফলে কিছু বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয়, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এই বর্জ্য পদার্থগুলোকে শরীর থেকে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়াকেই বলে রেচন।
মানুষের রেচনতন্ত্র (Human Excretory System):
- এর প্রধান অঙ্গ হলো একজোড়া বৃক্ক বা কিডনি (Kidneys)।
- বৃক্ক রক্তকে ছেঁকে ইউরিয়ার মতো বর্জ্য আলাদা করে মূত্র তৈরি করে।
- বৃক্কের ভেতরে লক্ষ লক্ষ সূক্ষ্ম ছাঁকনি ইউনিট আছে, যাদের নেফ্রন (Nephrons) বলে। এরাই আসলে রক্ত পরিস্রাবণের কাজটা করে।
- তৈরি হওয়া মূত্র গবিনী (Ureter) দিয়ে মূত্রাশয়ে (Urinary Bladder) জমা হয় এবং মূত্রনালী (Urethra) দিয়ে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়।
উদ্ভিদের রেচন (Excretion in Plants):
উদ্ভিদের নির্দিষ্ট কোনো রেচন অঙ্গ নেই। তারা বিভিন্ন উপায়ে বর্জ্য ত্যাগ করে:
- গ্যাসীয় বর্জ্য পত্ররন্ধ্র দিয়ে বের করে দেয়।
- অতিরিক্ত জল বাষ্পমোচনের মাধ্যমে বের করে।
- কিছু বর্জ্য পদার্থ আঠা (Gum) বা রজন (Resin) হিসেবে জমিয়ে রাখে।
- অনেক বর্জ্য পুরনো পাতায় জমা করে রাখে, যা পরে ঝরে যায়।