অধ্যায় ৩: ধাতু ও অধাতুর জগৎ

দিন/রাত

CLASS NO: 03

ভূমিকা: আমাদের চারপাশের দুই ধরনের বন্ধু

বন্ধুরা, তোমরা তোমাদের চারপাশে কত জিনিস দেখতে পাও—লোহার রড, সোনার গয়না, তামার তার, আবার পেন্সিলের সিস (গ্রাফাইট), নিঃশ্বাসের অক্সিজেন। এদের মধ্যে কিছু হলো ধাতু (Metal) আর কিছু হলো অধাতু (Non-metal)

কিন্তু আমরা এদের চিনব কী করে? কে ধাতু আর কে অধাতু? চলো, আজ আমরা এই দুই ধরনের বন্ধুর সাথে আলাপ করি আর তাদের স্বভাব ও চরিত্রগুলো জেনে নিই।

পর্ব ১: কে দেখতে কেমন? (ভৌত ধর্ম)

১. ধাতুদের পরিচয় (Meet the Metals):

ধাতুরা হলো অনেকটা ক্লাসের হিরোদের মতো!

২. অধাতুদের পরিচয় (Meet the Non-metals):

অধাতুরা হলো ক্লাসের শান্ত, লাজুক ছাত্রদের মতো। ওরা ধাতুদের ঠিক উল্টো।

কিছু ব্যতিক্রমী বন্ধু (The Rule-breakers):

  • পারদ (Mercury): একমাত্র ধাতু যা সাধারণ তাপমাত্রায় তরল।
  • সোডিয়াম, পটাশিয়াম: এরা এমন নরম ধাতু যে ছুরি দিয়ে কেকের মতো কাটা যায়!
  • গ্যালিয়াম, সিজিয়াম: এই দুটো ধাতু হাতের তালুতে রাখলেই গলে যায়!
  • আয়োডিন: অধাতু হলেও এর চেহারা কিন্তু বেশ চকচকে।
  • কার্বন: এর একটা রূপ হলো হীরে (সবচেয়ে কঠিন), আরেকটা রূপ হলো গ্রাফাইট (নরম ও বিদ্যুৎ পরিবাহী)।

পর্ব ২: কার সাথে কার বন্ধুত্ব? (রাসায়নিক ধর্ম)

১. যখন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে দেখা হয়:

ধাতুরা অক্সিজেনের সাথে মিলে ধাতব অক্সাইড (Metal Oxide) তৈরি করে, যা সাধারণত ক্ষারীয় প্রকৃতির হয়।

ধাতু + অক্সিজেন → ধাতব অক্সাইড

২. যখন জলের সাথে দেখা হয়:

ধাতু + জল → ধাতব অক্সাইড/হাইড্রক্সাইড + হাইড্রোজেন গ্যাস

৩. বিক্রিয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী তালিকা (The Reactivity Series):

যে কোনো শক্তিশালী ধাতু তার চেয়ে কম শক্তিশালী ধাতুকে তার লবণের দ্রবণ থেকে সরিয়ে দিতে পারে। একে বলে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Displacement Reaction)

তালিকা: K > Na > Ca > Mg > Al > Zn > Fe > Pb > (H) > Cu > Hg > Ag > Au

যেমন, লোহার পেরেকের থেকে কপার দুর্বল। তাই কপার সালফেট দ্রবণে (নীল রঙের) লোহার পেরেক ডোবালে শক্তিশালী লোহা কপারকে সরিয়ে দিয়ে আয়রন সালফেট তৈরি করে আর দ্রবণের নীল রঙটা হালকা হয়ে যায়।

পর্ব ৩: বন্ধুত্ব কীভাবে হয়? (আয়নীয় যৌগ)

ধাতু আর অধাতু যখন মেশে, তখন এক ধরনের দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক তৈরি হয়।

এই দেওয়া-নেওয়ার ফলে একটা শক্তিশালী আকর্ষণ তৈরি হয়, যাকে বলে আয়নীয় বন্ধন (Ionic Bond)। আর যে যৌগ তৈরি হয়, তাকে বলে আয়নীয় যৌগ (Ionic Compound)। যেমন, খাবার নুন বা সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl)।

আয়নীয় যৌগের চরিত্র:

  1. কঠিন ও ভঙ্গুর: এরা খুব শক্তিশালী বন্ধনে বাঁধা থাকে, তাই এরা কঠিন হয়। কিন্তু চাপ দিলে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়।
  2. উচ্চ গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক: এই শক্তিশালী বন্ধন ভাঙতে প্রচুর তাপ লাগে।
  3. জলে দ্রবণীয়: এরা সাধারণত জলে গুলে যায়।
  4. বিদ্যুৎ পরিবহন: কঠিন অবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবহন করে না। কিন্তু জলে গুলে গেলে বা গলে গেলে এদের আয়নগুলো ছাড়া পেয়ে যায় এবং বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে।

পর্ব ৪: মাটির তলার গুপ্তধন (ধাতু নিষ্কাশন)

আমরা ধাতু পাই কোথা থেকে? মাটির তলা থেকে!

ধাতু নিষ্কাশনের পদ্ধতি নির্ভর করে তার সক্রিয়তার ওপর:

  1. কম সক্রিয় ধাতু (সোনা, রুপো): এদের অক্সাইডকে শুধু গরম করলেই ধাতু আলাদা হয়ে যায়।
  2. মাঝারি সক্রিয় ধাতু (লোহা, জিঙ্ক): প্রথমে আকরিককে অক্সাইডে পরিণত করা হয় (রোস্টিং বা ক্যালসিনেশন)। এরপর, অক্সাইডকে কার্বন (কোক) দিয়ে বিজারিত করে ধাতু বের করা হয়।
  3. বেশি সক্রিয় ধাতু (সোডিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম): এদের যৌগ থেকে ধাতু বের করার জন্য তড়িৎ বিশ্লেষণ (Electrolysis) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

ধাতুর শোধন (Refining of Metals):

এইভাবে পাওয়া ধাতু পুরোপুরি খাঁটি হয় না। একে খাঁটি করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তড়িৎ শোধন (Electrolytic Refining)

শেষ পর্ব: মরচে পড়া ও তার থেকে বাঁচা (Corrosion and its Prevention)

ধাতুরা যখন বাতাস আর জলের সংস্পর্শে আসে, তখন ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। একে বলে ক্ষয় বা মরিচা (Corrosion)

মরচের হাত থেকে বাঁচানোর উপায়:

  1. রঙ, তেল বা গ্রিজ লাগিয়ে।
  2. গ্যালভানাইজেশন (Galvanization): লোহার ওপর জিঙ্কের একটা পাতলা আস্তরণ দেওয়া।
  3. অ্যালোয় বা সংকর ধাতু তৈরি (Alloying): এটা সবচেয়ে ভালো উপায়। একটা ধাতুর সাথে অন্য ধাতু বা অধাতু মিশিয়ে নতুন শক্তিশালী পদার্থ তৈরি করা হয়। যেমন:
    • স্টেইনলেস স্টিল: লোহা + নিকেল + ক্রোমিয়াম (এতে মরচে ধরে না)।
    • পিতল (Brass): তামা + জিঙ্ক।
    • ব্রোঞ্জ (Bronze): তামা + টিন।
    • ২২ ক্যারেট সোনা: ২৪ ক্যারেট নরম সোনার সাথে তামা বা রুপো মিশিয়ে শক্ত গয়না বানানো হয়।