বন্ধুরা, তোমরা তো কত রকম খাবার খাও! কোনোটা খেতে টক, যেমন লেবু বা তেঁতুল। আবার কোনোটা একটু তেতো, যেমন করলা বা নিমপাতা। কখনও ভেবে দেখেছ, এই স্বাদগুলো কেন হয়?
এর পেছনের আসল কারিগর হলো দুটো জিনিস: অ্যাসিড (Acid) আর ক্ষার (Base)।
বাড়িতে কেউ হয়তো বিয়েবাড়িতে অনেক বিরিয়ানি খেয়ে ফেলেছে। তারপর বলছে, "ওফ! বুকটা জ্বালা করছে, অম্বল বা অ্যাসিডিটি হয়ে গেছে।" তখন তুমি কী দেবে? লেবুর রস? না! তুমি দেবে বেকিং সোডার জল।
কেন বলো তো? কারণ, অম্বল হয় পেটের ভেতর অ্যাসিড বেড়ে গেলে। আর বেকিং সোডা হলো একটা ক্ষার। অ্যাসিড আর ক্ষার হলো একে অপরের শত্রু। যখন ওরা একসাথে হয়, তখন একে অপরের শক্তিকে নষ্ট করে দেয়। তাই ক্ষার পেটের অতিরিক্ত অ্যাসিডকে শান্ত করে দেয় আর আরাম মেলে।
সব জিনিস তো আর আমরা জিভে দিয়ে চেখে দেখতে পারি না, তাই না? যেমন, ল্যাবের রাসায়নিক পদার্থ। তাহলে কোনটা অ্যাসিড আর কোনটা ক্ষার, বুঝব কী করে?
এর জন্য আছে এক জাদুর জিনিস, যার নাম নির্দেশক (Indicator)। এরা হলো এমন এক ধরনের পদার্থ যারা অ্যাসিড বা ক্ষারের সংস্পর্শে এলে নিজের রঙ বদলে ফেলে।
সবচেয়ে জনপ্রিয় নির্দেশক হলো লিটমাস কাগজ।
হলুদও কিন্তু একটা প্রাকৃতিক নির্দেশক। দেখেছ, সাদা কাপড়ে ঝোলের হলুদ দাগ লাগলে, সাবান (ক্ষার) দিয়ে ঘষলেই সেটা লালচে-খয়েরি হয়ে যায়! আবার জল দিয়ে ধুলে আগের মতো হলুদ হয়ে যায়।
এই অধ্যায়ে আমরা এই অ্যাসিড, ক্ষার আর তাদের বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হওয়া লবণ (Salt) নিয়ে আরও অনেক মজার জিনিস জানব।
ভাবো, অ্যাসিড হলো একজন শক্তিশালী যোদ্ধা আর জিঙ্ক (Zinc) বা লোহা হলো একটা রাজ্য।
যখনই কোনো অ্যাসিড (যেমন সালফিউরিক অ্যাসিড) কোনো ধাতুর (যেমন জিঙ্ক) ওপর পড়ে, তখন একটা যুদ্ধ শুরু হয়। অ্যাসিড তখন ধাতু থেকে হাইড্রোজেন (Hydrogen) গ্যাসকে বের করে দেয় আর নিজে ধাতুর সাথে জুড়ে গিয়ে লবণ তৈরি করে।
এই যে হাইড্রোজেন গ্যাসটা বেরিয়ে আসে, তাকে চিনব কী করে? যদি একটা জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি ওই গ্যাসের সামনে ধরো, তাহলে গ্যাসটা ‘পপ্’ করে একটা আওয়াজ করে জ্বলে উঠবে। এটাই হাইড্রোজেন গ্যাসের পরিচয়!
কিছু ক্ষারও ধাতুর সাথে একই রকম বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে, তবে সব ক্ষার বা সব ধাতু এটা করে না।
এটা তো তোমরা বাড়িতেও করে দেখতে পারো! বেকিং সোডা (সোডিয়াম বাইকার্বনেট) হলো একটা ধাতব বাইকার্বনেট। এর মধ্যে একটু লেবুর রস (অ্যাসিড) দিয়ে দেখো তো কী হয়?
অনেক বুদবুদ উঠবে, তাই না? এই বুদবুদের গ্যাসটা হলো কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂)। আমরা নিঃশ্বাসের সাথে এই গ্যাসটাই ছাড়ি।
এই কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসকে চেনার উপায় কী? যদি এই গ্যাসটাকে চুনের জলের মধ্যে দিয়ে পাঠানো হয়, তাহলে চুনের জলটা দুধের মতো ঘোলা হয়ে যায়।
আগেই বলেছি, অ্যাসিড আর ক্ষার একে অপরের শত্রু। যখন একটা অ্যাসিড আর একটা ক্ষারকে একসাথে মেশানো হয়, তখন তারা একে অপরের শক্তিকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। এই মজার বিক্রিয়াটাকে বলে প্রশমন বিক্রিয়া (Neutralisation Reaction)।
এই বিক্রিয়ার ফলে দুটো একদম নিরীহ আর দরকারি জিনিস তৈরি হয়: লবণ আর জল।
কেন সব অ্যাসিড একই রকম আচরণ করে? আর কেনই বা সব ক্ষার?
একটা অ্যাসিডকে যখন জলে গোলা হয়, তখন সে হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺) ছেড়ে দেয়। এই H⁺ আয়নই হলো অ্যাসিডের সব ক্ষমতার উৎস। যে অ্যাসিড যত সহজে আর যত বেশি H⁺ আয়ন ছাড়তে পারে, সে তত শক্তিশালী অ্যাসিড। এই আয়নের জন্যই অ্যাসিড বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে।
একইভাবে, একটা ক্ষারকে জলে গোলার পর সে হাইড্রক্সাইড আয়ন (OH⁻) ছেড়ে দেয়। এই OH⁻ আয়নই হলো ক্ষারের আসল শক্তি। যে ক্ষার যত বেশি OH⁻ আয়ন ছাড়ে, সে তত শক্তিশালী।
গুরুত্বপূর্ণ কথা:
জল ছাড়া কিন্তু অ্যাসিড বা ক্ষার তাদের শক্তি দেখাতে পারে না! শুকনো হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl) গ্যাস কিন্তু নীল লিটমাসকে লাল করতে পারবে না। কারণ জল না থাকলে H⁺ আয়ন তৈরিই হবে না।
মনে রাখবে, অ্যাসিডকে পাতলা করার সময় সবসময় অ্যাসিডকে অল্প অল্প করে জলে ঢালতে হয়, উল্টোটা নয়! অর্থাৎ, জলে অ্যাসিড মেশাতে হয়, অ্যাসিডে জল নয়। কারণ অ্যাসিডে জল ঢাললে প্রচুর তাপ তৈরি হয়, যা থেকে বিস্ফোরণ হতে পারে বা পাত্র ফেটে যেতে পারে।
কোন অ্যাসিড কতটা শক্তিশালী বা কোন ক্ষার কতটা শক্তিশালী, সেটা মাপার জন্য একটা স্কেল আছে। একে বলে pH স্কেল। এই স্কেলে ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত দাগ কাটা থাকে।
অ্যাসিড আর ক্ষারের বিক্রিয়ায় যা তৈরি হয়, তাই হলো লবণ। আমরা যে নুন (সোডিয়াম ক্লোরাইড) খাই, সেটাও একটা লবণ।
লবণেরও পরিবার আছে! যেমন সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) আর সোডিয়াম সালফেট (Na₂SO₄) হলো "সোডিয়াম পরিবার"-এর লবণ। আবার সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) আর পটাশিয়াম ক্লোরাইড (KCl) হলো "ক্লোরাইড পরিবার"-এর লবণ।
কিছু লবণকে দেখতে শুকনো মনে হলেও তাদের ভেতরে জলের অণু লুকিয়ে থাকে। একে বলে কেলাস-জল।
যেমন, কপার সালফেট (তুঁতে) দেখতে নীল রঙের হয়, কারণ এর মধ্যে জলের অণু আছে (CuSO₄.5H₂O)। যদি এটাকে গরম করা হয়, তাহলে জলটা উড়ে যায় আর তুঁতেটা সাদা হয়ে যায়। আবার জল দিলেই আগের মতো নীল হয়ে যাবে!
এটাও একটা দারুণ লবণ! হাত-পা ভাঙলে ডাক্তাররা যে প্লাস্টার করে দেন, সেটাই হলো প্লাস্টার অফ প্যারিস। এটা একটা সাদা পাউডার। জল মেশালেই এটা জমে শক্ত হয়ে যায় আর ভাঙা হাড়কে নড়াচড়া করতে দেয় না। মূর্তি বা খেলনা বানাতেও এটা ব্যবহার হয়।